Wed. Feb 1st, 2023

    …………………………

    প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি আমাদের প্রচুর মর্যাদার ঘাটতি রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে আমরা এমন অবস্থায় নিয়ে গেছি যে, সরকারের নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারীরদের চেয়েও সুযোগ-সুবিধা কম পান আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
    ……..
    দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল শুন্য, অর্থনীতি বিধ্বস্ত,সেই সময়ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সকল প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করেছিলেন। অর্থাৎ সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারী কোষাগার থেকে বেতন ভাতা পাওয়া শুরু করেছিলেন।

    …………………………

    কারণ বঙ্গবন্ধু জানতেন, নতুন এই দেশটির ভিত্তি যদি শক্ত করতে হয় তাহলে শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে।আর এই শিক্ষা হলো প্রাথমিক শিক্ষা। তাই তিনি সংবিধানে সংযুক্ত করলেন যে দেশের সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক।

    যেহেতু প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছেন সেহেতু সেটাকে তিনি অবৈতনিক করে দিলেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ভাতার যাতে কোন সমস্যা না হয় সেকারণে এটাকে তিনি সরকারের অধীনে নিয়ে এসেছিলেন।

    বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কলেজের শিক্ষক বা সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের যে বেতন-ভাতা, সুযোগ সুবিধা রয়েছে তার তুলনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনেক বঞ্চিত হচ্ছেন। এই জায়গায় আমার মনে হয় অনেক কিছু করার আছে, এখানে একটা বড় ধরণের পরিবর্তন আনার দরকার আছে । কারণ শিশুদেরকে যারা শিক্ষা দিচ্ছেন, তারাই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করছেন। এই শিশুদের জীবনের ভিত্তি রচনা করে দিচ্ছেন।

    এই শিক্ষক কারা হবেন? এই শিক্ষকরা হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী তরুণরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ভালো ফলাফল করে বেরিয়েছেন, এমন তরুণরাই প্রাথমিক শিক্ষায় আকৃষ্ট হবেন। এই মেধাবীরা যদি শিশুদের শিক্ষা দেন তবে সেই শিশুরা সঠিক শিক্ষা নিয়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকে যাবেন। কিন্তু আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কি তেমন শিক্ষক নিয়োগ দিতে সমর্থ হচ্ছি? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় আমরা কাদেরকে দেখতে পাচ্ছি?

    …………………………

    যারা অন্য কোথাও কোনো সুযোগ পাচ্ছে না তারা বাধ্য হয়ে প্রাথমিক শিক্ষকতায় আসতেছেন। যেসব মেধাবী প্রাথমিক শিক্ষকতায় আসতেছেন তারাও কিন্তু স্থির থাকছেন না, চেষ্টা করে যাচ্ছেন অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য। একটা সরকারি কেরাণীর চাকরি পেলেও তারা শিক্ষকতা ছেড়ে চলে যান।

    আবার আগে প্রাথমিক শিক্ষকদের একটা সামাজিক মর্যাদা ছিল। আমরা দেখেছি, আমাদের শিক্ষকদেরকে আমাদের অভিভাবকরা সম্মান করতেন, সমাজের সবাই সম্মান করতেন। এখন কিন্তু পরিবারেও সেই সম্মানটা দেয়া হচ্ছে না।

    একই পরিবারে যদি ৫জন সন্তান থাকে,একজন সরকারি কর্মকর্তা, একজন ব্যাংকার, একজন চিকিৎসক, একজন প্রকৌশলী এবং একজন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। দেখা যাবে যে অভিভাবকরাও বাকি ৪ সন্তানকে যত উৎসাহের সাথে অন্যদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, প্রাথমিকের শিক্ষক সন্তানটিকে সেভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন না।

    তারা বলেন, ও(প্রাথমিক শিক্ষক) এখন একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন, ওটা ছেড়ে দেবে, বিসিএস এর জন্য চেষ্টা করছেন। মানে পরিবার থেকেই আমরা প্রাথমিক শিক্ষকদের মূল্য দিচ্ছি না। আর সরকার থেকে মানসম্মত বেতন-ভাতাও দিচ্ছি না। তাহলে এখানে মেধাবী ছেলে মেয়েরা থাকবেন কেন? তাদের হাতে তো আরও বহু বিকল্প চাকরি রয়েছে।

    তাই আমাদের এমন অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে, যাতে প্রাথমিক স্কুলে পড়ানোটা অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষক হওয়া দেশের মেধাবীদের একটা লক্ষ্য হয়।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ।