Thu. Feb 2nd, 2023

    বাঙালি মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলাে কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসা-ভাসাভাবে, অনেককিছুই জানার ভান করে, আসলে তার জানাশােনার পরিধি খুবই সংকুচিত। বাঙালি মুসলমানের মন এখনাে একেবারে অপরিণত, সবচেয়ে মজার কথা, একথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না।

    যেহেতু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রসারমান যান্ত্রিক কৃৎকৌশল স্বাভাবিকভাবে বিকাশলাভ করছে এবং তার একাংশ সুফলগুলােও ভােগ করছে, ফলে তার অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ইচড়ে পাকা শিশুর মত।

     

    অনেককিছুরই সে সংবাদ জানে, কিন্তু কোন কিছুকে চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, মনীষা দিয়ে আপনার করতে জানে না। যখনই কোন ব্যবস্থার মধ্যে কোনরকম অসঙ্গতি দেখা দেয়, গোঁজামিল দিয়েই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় এবং এই গোজামিল দিতে পারাটাকে রীতিমত প্রতিভাবানের কর্ম বলে মনে করে।

    শিশুর মত যা কিছু হাতের কাছে, চোখের সামনে আসে, তাই নিয়েই সে সন্তুষ্ট, দূরদর্শিতা তার একেবারেই নেই। কেননা একমাত্র চিন্তাশীল মনই আগামীকাল কি ঘটবে সে বিষয়ে চিন্তা করতে জানে। বাঙালি মুসলমান বিমূর্তভাবে চিন্তা করতে জানে না এবং জানে না এই কথাটি ঢেকে রাখার যাবতীয় প্রয়াসকে তার কৃষ্টি-কালচার বলে পরিচিত করতে কুণ্ঠিত হয় না।

     

    বাঙালি মুসলমানের সামাজিক সৃষ্টি, সাংস্কৃতিক সৃষ্টি, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিসমূহের প্রতি চোখ বুলােলেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

    যে জাতি উন্নত বিজ্ঞান, দর্শন এবং সংস্কৃতির স্রষ্টা হতে পারে না, অথবা সেগুলােকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না, তাকে দিয়ে উন্নত রাষ্ট্র সৃষ্টিও সম্ভব নয়।

    যে নিজের বিষয় নিজে চিন্তা করতে জানে না, নিজের ভাল-মন্দ নিরূপণ করতে অক্ষম, অপরের পরামর্শ এবং শােনা কথায় যার সমস্ত কাজ-কারবার চলে, তাকে খােলা থেকে আগুনে, কিংবা আগুন থেকে খােলায়, এইভাবে পর্যায়ক্রমে লাফ দিতেই হয়। সুবিধার কথা হল নিজের পঙ্গুত্বের জন্য সব সময়েই দায়ী করবার মত কাউকে না কাউকে পেয়ে যায়। কিন্তু নিজের দুর্বলতার উৎসটির দিকে একবারও দৃষ্টিপাত করে না।

     

    বাঙালি মুসলমানদের মন যে এখনাে আদিম অবস্থায়, তা বাঙালি হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুন তার মনের উপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত রয়েছে, সজ্ঞানে তার বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যাদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়।

    মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে। দু’ বছরে কিংবা চার বছরে হয়ত এ অবস্থার অবসান ঘটানাে যাবে না, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের মনের ধরন-ধারণ এবং প্রবণতাগুলাে নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়ত পাওয়াও যেতে পারে।

     — আহমদ ছফা ( বাঙ্গালী মুসলমানের মন বইতে এই কথাগুলো লিখেছেন।)

    Worthy Talk BD || worthytalkbd