Sat. Feb 4th, 2023

    …………………………

    জন্ম থেকেই বাঁ পা ও কোমর বাঁকা তাঁর। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়। মাদ্রাসা থেকে দাখিল (মাধ্যমিক) পাস করে চাকরি নিয়েছিলেন। কিন্তু বেতন কম হওয়ায় সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। শেষে কোয়েল পালন শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই পান সাফল্য। কোয়েল পাখি ও ডিম বিক্রি করে এখন তাঁর সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

    এই পরিশ্রমী ও হার না-মানা তরুণের নাম মো. সালাউদ্দিন হাওলাদার। বয়স মাত্র ২৯। বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের জায়গীর এলাকায়। বিয়ে করেছেন কিছুদিন আগে। হতাশার অন্ধকারে ডুবে যাওয়া এই যুবক কোয়েল পাখি পালন করে                                                                              এখন দেখছেন সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কোয়েলের পাশাপাশি তিনি দেশি-বিদেশি কবুতর ও অন্যান্য পাখি পালন করছেন। করছেন পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ। সব মিলিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি খামার। এর নাম ‘মামনুন কোয়েল ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারি’। বাড়ির আঙিনায় সালাউদ্দিনের খামার। এই খামারে তিনজন কর্মচারী কাজ করেন।

    …………………………

    যেভাবে শুরুঃ  ২০১৬ সালে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন সালাউদ্দিন। কী করবেন, তা বুঝতে পারছিলেন না। এর মধ্যে একদিন শখের বশেই বাড়ির পাশের একটি হাট থেকে ছয়টি কোয়েল পাখি কিনে আনেন তিনি। তিন মাস পর্যন্ত ছয়টি কোয়েল পাখি পালন করেন। পাখিগুলো প্রতিদিন ডিম দিত। পরিবার ও আত্মীয়স্বজন নিয়ে ডিমগুলো খেতেন। তখন সালাউদ্দিন বেকার ছিলেন। নিজে মুঠোফোনও চালাতেন না। অন্যের মুঠোফোনে ইউটিউবে                                                               কোয়েল পালনের একটি ভিডিও দেখেন তিনি। ভিডিওটা দেখেই তাঁর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে কোয়েল পালনের চিন্তা শুরু হয়। মায়ের পরামর্শে ও তাঁর দেওয়া স্বর্ণালংকার বিক্রি করে তিনি ঢাকার নিমতলীতে গিয়ে ৩০০ কোয়েল পাখি কিনে আনেন। সেই ৩০০ কোয়েল পাখি থেকে এখন তাঁর খামারে সাড়ে তিন হাজার কোয়েল পাখি।

    খামারে নানা কার্যক্রমের বিষয়ে সালাউদ্দিন বলেন, তাঁর খামারে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৪০০ কোয়েল ডিম পাড়ে। প্রতিটি ডিম আড়াই টাকা দরে বিক্রিও হয়। কোয়েলের বাচ্চা উৎপাদনের জন্য একটি যন্ত্র কিনেছেন। ওই যন্ত্র দিয়ে তিনি ১৬ দিন পরপর ১ হাজার ৪৮৫টি বাচ্চা উৎপাদন করেন। উৎপাদিত কোয়েলের বাচ্চাগুলো দুই মাস পরপর                                                                     ঢাকার নিমতলীতে নিয়ে বিক্রি করেন। কোয়েল পাখির পাশাপাশি বাজিগর পাখি, অস্ট্রেলিয়ান ঘুঘু, দেশি-বিদেশি কবুতর পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি বাড়ির পাশে তিনটি পুকুর ইজারা নিয়ে দেশি শিং, কই, রুই, কাতলাসহ নানা প্রজাতির মাছ চাষ করছেন।

    …………………………

    সালাউদ্দিনের বাবা সামছুল হক হাওলাদার বলেন, ‘ছেলেকে মাদ্রাসা লাইনে পড়ালেখা শিখাই। পরে একটি মাদ্রাসায় চাকরিও হয়। কিন্তু সেখানে যে টাকা দিত, তা দিয়ে আমাদের সংসার অনেক কষ্টে চলত। ছেলের ফার্মে যে এত আয় হবে, তা কখনোই কল্পনা করিনি।’

    কোয়েল পালন করে কেমন আয় হয়, জানতে চাইলে সালাউদ্দিন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৪০০ ডিম বিক্রি করি। দুই মাস পরপর ৩০০ কোয়েল পাখি বিক্রি করি। প্রতিটি পাখি ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়।’ তিনি আরও বলেন, কোয়েল পাখি বিক্রির পাশাপাশি তিনি                                                                                উন্নত জাতের বিদেশি প্রতি জোড়া কবুতর, ঘুঘু পাখি ৩ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে তাঁর এক লাখ টাকা আয় হয়।
    ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সালাউদ্দিন বলেন, ‘খামারকে আরও সম্প্রসারণ করার চেষ্টা করছি। স্বপ্ন আছে আশপাশের খালি জমি ইজারা নিয়ে সেখানে অনেক বড় করে খামার দেব। সেখানে আরও কিছু বেকার যুবককে কাজ দেব। সরকারি সহযোগিতা এখনো পাইনি। ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পেলে গবাদিপশু পালনের ইচ্ছা আছে।’

    …………………………

    জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, ‘যাঁরা গরু, হাঁস, মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের পশুপাখি পালন করতে চান, আমরা তাঁদের বিভিন্ন ধরনের                                                              প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করি। পশুপাখি যদি রোগে আক্রান্ত হয়, সে ক্ষেত্রে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। কালকিনিতে যে যুবক কোয়েল পালন করছেন, তাঁকে আমরা প্রয়োজনে সব ধরনের সহযোগিতা দেব।’
    তথ্যসুত্রঃ প্রথম আলো (মাদারীপুর,  প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯)