Thu. Feb 2nd, 2023

    …………………………

    দক্ষিণ কোরিয়ায় সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার রোবট তৈরি করেছেন বাংলাদেশের তরুণ লাবিব তাজওয়ার রহমান। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা ইনক্লুশন এক্স নামের একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থী প্রতিবন্ধীদের ভাষা নির্দেশিকা নিয়েও কাজ করছেন। গবেষক পদে কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ম্যাসেঞ্জারে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপ হয়েছে তার।
    …..
    ঢাকা পোস্ট : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে আপনাকে নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই আপনার সম্পর্কে কৌতূহলের শেষ নেই। শুরুতেই আপনার সম্পর্কে জানতে চাই-

    …………………………

    লাবিব তাজওয়ার রহমান : আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা বাংলাদেশেই। মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করার পর, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সৌভাগ্য হয়। তারপর থেকে আমি স্ট্যানফোর্ড হিউম্যান-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশন গ্রুপ, ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ (সার্ন) এবং স্ল্যাক ন্যাশনাল অ্যাক্সেলারেটর ল্যাবরেটরি, স্ট্যানফোর্ড স্কুল অফ মেডিসিন এবং সিইআরএন-এ রিসার্চার পদে কাজ করেছি। আমি স্ট্যানফোর্ড ফিজিক্স সোসাইটির সঙ্গেও জড়িত আছি। বর্তমানে স্ট্যানফোর্ড ফিজিক্স সোসাইটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

    ঢাকা পোস্ট : আপনি নিউবিলিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এর কাজ কী? কীভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন?

    লাবিব তাজওয়ার রহমান: ২০১৫ সালে নাসার কেনেডিতে অনুষ্ঠিত হওয়া কনরাড চ্যালেঞ্জে যোগ দিয়েছিলাম। সেখানে অ্যান্ড্রু লি এবং চেওংহো-চো- নামের দুই কোরিয়ানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমরা একসঙ্গেই অ্যাওয়ার্ডে অংশগ্রহণ করেছি। এতে শীর্ষ ৬ এ ছিলাম। প্রতিযোগিতার মধ্যেই আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রতিযোগিতার পরেও আমরা যোগাযোগ রেখেছিলাম এবং প্রযুক্তিগত বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা কী ধরনের প্রজেক্ট করতে পারি তা নিয়েও আলোচনা হত এবং চিন্তা ভাবনা করতাম। পরে সবাই ঠিক করলাম রোবট নিয়ে কাজ করব। তখন আমাদের রোবট বানানোর প্রতিষ্ঠানের নাম দিলাম ‘নিউবিলিটি’।

    ঢাকা পোস্ট : নিউবিলিটি নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাই-

    …………………………

    লাবিব তাজওয়ার রহমান : নিউবিলিটি হল ক্যামেরা-ভিত্তিক সেলফ-ড্রাইভিং সলিউশন এবং রোবোটিক্স প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা এবং ডেভেলপ করার প্রতিষ্ঠান। সিউল ভিত্তিক আমাদের এ দলটি বর্তমানে শেষ মাইল (রেস্টুরেন্ট থেকে বাসা) ডেলিভারি নিয়ে কাজ করছে। ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স বাজারের কারণে, কোরিয়ান ব্যবসার জন্য শেষ-মাইল ডেলিভারির খরচ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে তারা আরও সাশ্রয়ী বিকল্পের সন্ধান করছে। কারণ কোরিয়ার বেশিরভাগ মানুষ শিক্ষিত। তাদের দিয়ে ডেলিভারির কাজ করাতে গেলে খরচ গুনতে হয় অনেক বেশি। ফলে কোরিয়ান ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে অটোমেশনের আকারে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা খুঁজছেন। আর নিউবিলিটি ঠিক সে জায়গাটা নিয়েই কাজ করছে। আমরা কোরিয়াতে ফুড ডেলিভারির জন্য অটোমেশন রোবট বানিয়েছি।

    ঢাকা পোস্ট : আপনি ইনক্লুশন এক্স নামেও একটি সংগঠন করেছিলেন। সে সম্পর্কে বলুন-

    লাবিব তাজওয়ার রহমান : ২০১৫ সালে আমি ইনক্লুশন এক্স প্রতিষ্ঠা করি। যা বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ে কাজ করছে। আমাদের প্রোগ্রাম এবং সেবাগুলো বছরে ত্রিশ হাজারেরও বেশি লোক ব্যবহার করেছে। অনলাইনে পোস্ট করা আমাদের কনটেন্ট ৫ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ হচ্ছে। আমি স্ট্যানফোর্ডে প্রতিবন্ধীর জন্য ভাষা নির্দেশিকা রচনা করেছি। স্ট্যানফোর্ড প্রতিবন্ধী ভাষা গাইড হল, একটি ভাষা নির্দেশিকা যা আমরা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপেও ব্যবহার করতে পারি। এই নির্দেশিকাটি সরকারি অফিসে (মেরিল্যান্ড স্বাস্থ্য বিভাগ) ব্যবহার হয়। এছাড়াও স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন (বিশ্বের বৃহত্তম জাদুঘর, শিক্ষা এবং গবেষণা কমপ্লেক্স) এবং এটি একাধিক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যক্রম হিসেবে ব্যবহৃত হয় (যেমন মেইন মেডিকেল সেন্টার (টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়), ওয়েস্টার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়, ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়, মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি) প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হয়।

    ঢাকা পোস্ট : বর্তমানে আপনার হাতে গড়া নিউবিলিটি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির অর্জন কি কি?

    লাবিব তাজওয়ার রহমান : টেলিকম থেকে অটোমোবাইল শিল্পের অনেকেই বিনিয়োগ করার পাশাপাশি পার্টনারশিপ হিসেবে আমাদের সঙ্গে আছে। নিউবিলিটি সম্প্রতি বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত হওয়া মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে (এমডব্লিসি) একটি শীর্ষ স্টার্টআপ হিসেবে অংশগ্রহণ করেছে। এটি মোবাইল শিল্পের বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক প্রদর্শনী ও সম্মেলন।

    …………………………

    ঢাকা পোস্ট : এবার একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার শুরুর গল্প শুনতে চাই-

    লাবিব তাজওয়ার রহমান : ইনক্লুশন এক্স দিয়ে আমার উদ্যোক্তা জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমার ইনক্লুশনএক্স যাত্রা শুরু হয়েছিল আমার বড় ভাই অর্নবের সঙ্গে। সে সেরিব্রাল পলসি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল। ২০০৭ সালে অর্ণব ভাইয়া খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং প্রথমবারের মতো আমার পরিবার আমার জন্মদিন উদযাপন করেনি। পরের দিন, আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম। আমি আমার মাকে খুঁজতে আমার ভাইয়ের ঘরে ঢুকলাম। আমার চোখে জল নিয়ে আমি তাকে বললাম, ‘আমি যদি অসুস্থ হতাম, তখন আপনি আমার যত্ন নিতেন।’ আমি রাগ করে রুম ছেড়ে চলে গেলাম এবং এক ঘণ্টা পরে আমার ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেল। দুই সপ্তাহ পরে, আমি স্কুলে যাই। একজন বন্ধু আমার কাছে এসে বলে, ‘আরে লাবিব, তোমার বর্তমান শোকাহত অবস্থার জন্য আমি খুব দুঃখিত, কিন্তু অনেক লোক আমাকে বলছে যে, তোমার ভাই পাগল ছিল। এটা কি সত্যি?’ এটি সত্যিই একটি বড় আঘাত ছিল। আমি আমার বন্ধু এবং আমার চারপাশের সহপাঠীদের কাছে চিৎকার করে বলতে চেয়েছিলাম যে আমার ভাই ‘পাগল’ নয়। সে আমার ভাই ছিল। আর আমার ভাই শুধু প্রতিবন্ধী ছিল। সেই দিন থেকে, আমি আমার বন্ধুদের প্রতিবন্ধীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে চেয়েছিলাম। সেই কথা মাথায় রেখে, ২০১৫ সালে, আমি ইনক্লুশন এক্স’র শুরু করেছিলাম।

    ঢাকা পোস্ট : আপনার এগিয়ে যাওয়া কিংবা পথচলার অনুভূতি সম্পর্কে বলুন-

    লাবিব তাজওয়ার রহমান : আমার জীবনের নীতিবাক্য হল ‘নির্ভয়ের সঙ্গে কৌতূহলী’। অর্থাৎ আমি যা করি বা করতে চাই, তা চালিয়ে যেতে থাকি। আমি নিজের সম্পর্কে কিছু সাধারণ পর্যবেক্ষণ পেয়েছি যেমন; যেকোনো সিস্টেম নিয়ে যে সমস্যা থাকে সেটা আমার কাছে অর্থবহ এবং আমাকে নাড়া দেয়।

    ঢাকা পোস্ট: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

    লাবিব তাজওয়ার রহমান : আমার লক্ষ্য হল- যেমন পৃথিবী পেয়েছি তার চেয়ে শতগুণ ভালো অবস্থানে রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চাই। যেকোনো ছোট কিংবা বড় সিস্টেম হোক না কেন, সেটাকে ডিজিটাল, স্বচ্ছ এবং সকলের জন্য অ্যাক্সেসযোগ্য করতে চাই। আমি নিজের পাশাপাশি অন্যদের জীবনযাপনকে এমনভাবে সাহায্য করতে চাই যাতে আমি যদি বৃদ্ধ হয়ে মারা যাই তবে মৃত্যুশয্যায় জানতে পারি যে পৃথিবী একটি সুখের জায়গা, কারণ আমরা সেখানে ছিলাম।

    ঢাকা পোস্ট : বাংলাদেশি তরুণদের জন্য কী উপদেশ দিবেন?

    লাবিব তাজওয়ার রহমান : আমি ধরাবাঁধা উপদেশ দিতে পছন্দ করি না। কিন্তু যেহেতু আমি নিজে একজন বাংলাদেশি, তাই আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই আমার পরামর্শ হল স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা। যদিও আপনি ভাবতে পারেন, পৃথিবী আরও জটিল হচ্ছে, আমরা আমাদের চারপাশের বিশ্বকে আরও ভালভাবে বোঝার জন্য নতুন জ্ঞানও তৈরি করছি। তাই এটা গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা কখনই শেখা বন্ধ না করি। পাশাপাশি জীবনযাপনে নিজেদের এবং একে অপরের যত্ন নিতে হবে।