Thu. Feb 2nd, 2023

    মো: আমিনুল ইসলাম

    পররাষ্ট্র ক্যাডার, ৩৬তম বিসিএস।

     

     

    আমার ধারণা ভাইভা বোর্ডের স্যারেরা ৪ ধরণের বল করে থাকেন- Half-volley, Bouncer, Yorker length ও Good length।

    ★ Half-volley: এই বলগুলোতে মূলত স্কোর করার সুযোগ থাকে। যেমন, ‘Introduce yourself’, ‘Why do you want to join ____ cadre?’, ‘Being a student of ____ (subject of graduation), how will you contribute in this cadre?’ এসব প্রশ্নে যৌক্তিক, চৌকশ, যথোপযোগী উত্তর দিয়ে সহজেই বোর্ডের সুনজরে চলে আসতে পারেন। একইসাথে Conference Boost-Up করতে পারবেন। এসব প্রশ্নের শক্ত উত্তর আগে থেকে ঠিক করে নেয়া যেতে পারে, অনুশীলন করা যেতে পারে। কিছু  VIVA বোর্ডে এই ক্যাটেগরির একই প্রশ্ন অনেক প্রার্থীকে করা হয়। বোর্ড জেনেশুনেই এটি করে থাকে যাতে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা যায়।

     

     

    ★ Good-length: এই প্রশ্নগুলো মূলত করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত বিষয়, পছন্দের প্রথম সারির দুই-তিনটি ক্যাডার, নিজ গ্রাম, নিজ UNIVERSITY/হল, সাম্প্রতিক বিষয়াবলী, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়াবলী নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, ফরেন ক্যাডারের কাউকে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে, “Tell us about different tracks of dilpomacy?”, “What is the difference between MoU and Treaty?”। আবার ধরুণ Economics এর কোন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করতে পারে, “What is Comparative Advantage theory?” ইত্যাদি ইত্যাদি। এই জাতীয় প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারলে স্যাররা বিরক্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই প্রিপারেশন নেবার সময় এই প্রশ্নগুলোর দিকে সচেতন থাকা উচিত।

    ★ Yorker Length: এই প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণধর্মী হয়। মূল লক্ষ্য আপনার Stress নেবার ক্ষমতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা, বিচক্ষণতা, পরিস্থিতি সামাল দেবার ক্ষমতা যাচাই করা। সময় নিন অল্প, সাবধানে ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর করুন। যেমন- ” দুর্নীতিগগ্রস্ত প্রশাসন সংস্কারে আপনি কি করবেন?”, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারতের সাথে যে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাচ্ছেন, তা কতটা যৌক্তিক?”।

     

    ★ Bouncer: এই প্রশ্নগুলোও বিশ্লেষণধর্মী হয়। এগুলোর উদ্দেশ্য আপনার গভীরতা যাচাই করা। এই বলগুলোও মারাত্মক। খেলতে না পারলে স্ট্যাম্প উড়বে না। খেলতে গিয়ে আঘাত পেলেও চলবে না। পারলে খেলবেন, না পারলে বিনয়ের সাথে ‘Sorry’ বলে দিন। যেমন ধরুন, “স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন কোন নেতা বঙ্গবন্ধুকে প্রথম আলিঙ্গন করেন?”

     

     

    ভাইভাতে নম্বর ভাল পেতে হলে Half-volley আর Good-length গুলোতে চার-ছক্কা পেটাতে হবে। Yorker আর Bouncer গুলোতে রান না তুললেও ভালভাবে মোকাবেলা করতে হবে; না পারলেও যে খুব সমস্যা হবে তা না। তবে বিব্রতকর কোন ঘটনার অবতারণা যাতে না হয়, সেজন্য বুদ্ধিমত্তা খাটানো উচিত।

     

    ★ বিশেষভাবে যা খেয়াল রাখা উচিত:

    ১) এগুলো জানা কথা! মার্জিত ডেস-কোড মেনে চলা ভাল। সাদা-শার্ট, কালো প্যান্টের সুখ্যাতি সর্বজন বিদিত। স্যুট পরিধান করা যেতে পারে, সেই সাথে ম্যাচ করে Dark-coloured tie পরিধান করা যেতে পারে।

    ২) ভাইভা বোর্ড আত্মবিশ্বাস আর স্মার্টনেস দেখাবারই জায়গা। তবে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত যেন কোনভাবেই নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিতে গিয়ে কোন উপায়ে ঔদ্ধত্য, অহমিকা বা ওভার-স্মার্টনেস প্রকাশ না পায়। যেমন, বাংলায় প্রশ্ন করলে ইংরেজিতে অথবা ইংরেজিতে প্রশ্ন করলে বাংলায় উত্তর করা যাবেনা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত অযাচিত উত্তর করা উচিত না। নম্রতাবর্জিত Smartness হচ্ছে ওভার-স্মার্টনেস, আর বিনয়ী ও নম্রতা মেশানো Smartness হচ্ছে প্রকৃত স্মার্টনেস। প্রজাতন্ত্রের কর্মে এধরণের প্রার্থীর কদর বেশি।

    ৩) ভাইভা বোর্ডের ভুল হলেও বোর্ডকে চ্যালেঞ্জ করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা; একান্ত আত্মবিশ্বাসী হলে বিনয়ের সাথে “আমার জানামতে, ……… ” এজাতীয় বাক্যাংশের আশ্রয় নেয়া যেতে পারে।

     

     

     

    ৪) আই-কন্ট্যাক্ট রেখে কথা বলাটা মার্জিত আচরণের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্নকর্তার অবস্থানভেদে শরীরের কৌণিক অবস্থান ঠিক করে নেয়া যেতে পারে।

    ৫) কম-বেশি বলা শুরু করুন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, খুবই। এই কয়দিন ক্রমাগত এটি অনুসরণ করতে পারেন। কল্পনা করুন ঠিক কীভাবে, কোন মুখভঙ্গি, বাচনভঙ্গিতে কথা বলবেন, কোন সুরে কথা বলবেন।উচ্চারণ শুধরে নিন প্রয়োজনে। এক্ষেত্রে, Half-volley অর্থাৎ একদম কমন প্রশ্নগুলোর উত্তর ঠিক করে বলা শুরু করুন। বলতে বলতে নিজেকে সাবলীল করে তুলুন। বন্ধুদের সাথে বলুন, নিজের সামনে আয়নায় বলুন। যুক্তিগুলো শাণিত করুন। মনে রাখবেন, বেশি পড়ার চাইতে বেশি বলার অনুশীলন করাটা অনেক বেশি কার্যকর। অনেক কিছু জেনে গিয়ে, কমন প্রশ্ন পেয়েও যদি সুন্দর, সাবলীলভাবে উত্তর উপস্থাপন করতে না পারেন তবে তা হবে হতাশার।

    ৬) বিব্রতকর অবস্থাগুলো কল্পনা করে রাখুন। সেক্ষেত্রে কীভাবে পরিস্থিতির প্রশমণ ঘটানো সম্ভব তা চিন্তা করুন। অনুকূল পরিবেশের প্রত্যাশায় দিবাস্বপ্ন না দেখে প্রতিকূল পরিস্থিতি কল্পনায় এনে তা সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা ঠিক করাটা বুদ্ধিমানের কাজ।

     

     

    ★ কি কি পড়বেন:

    ইতোমধ্যে নিশ্চয় দু’একটি চয়েস ভিত্তিক গাইড গিলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্ভরযোগ্য কিছু বই পড়েছেন। নিজ জেলা, গ্রাম, ভার্সিটি, সরকারের নীতিমালা, অর্জন, সাম্প্রতিক তথ্য জেনে নিয়েছেন।

    ★ এবার কী পড়বেন?

    শুধুই পত্রিকা। প্রথম আলো, Daily Star পড়তে পারেন। আর কোন আন্তর্জাতিক মাধ্যমের সংবাদ দেখা সম্ভব না হলেও, অন্তত BBC’র ওয়েবসাইটে উঁকিঝুঁকি দিন (অন্তত পররাষ্ট্র ক্যাডার প্রত্যাশীরা)। আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধের জন্য Project Syndicate বেশ প্রসিদ্ধ। ভাল টক-শো দেখতে পারেন। খুব বড় সম্ভাবনা রয়েছে যে, বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নগুলো পত্রিকাগুলো থেকেই করা হবে।তাই সকালের অপেক্ষায় না থেকে, ভাইভার আগের রাতেই অনলাইন সংস্করণ দেখে নিন। পত্রিকা ভালভাবে না পড়ে ভাইভা মোকাবেলা করাটা ঝুঁকিপূর্ণ।

     

     

    ভাইভা বোর্ডে ঢোকার আগে মনে রাখবেন, আপনি অনেক কিছু শিখেছেন, অনেক কিছু পড়েছেন কিন্তু হয়ত তারপরেও বোর্ডে ঢুকলে আপনার কাছে ভরা মজলিসে জানতে চাওয়া হবে ‘সোমালিয়ার মোগাদিসুতে জন্ম নেয়া প্রথম পাখির নাম কি?’ এবং আপনাকে তা মোকাবেলা করে সম্ভ্রম নিয়ে বের হতে হবে। আর রাষ্ট্রের স্বার্থে সেই প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে দেশের জন্য কাজ করার লক্ষ্যেইতো ক্যাডার সার্ভিসের সৃষ্টি। আর সব কথার শেষ কথা, “অদৃষ্ট বলে কিছু একটা আছে!” যা অনেক যোগ্য প্রার্থীকেও লাইনচ্যুত করতে পারে মুহূর্তে। ভরসা রাখুন নিজের উপর, সৃষ্টিকর্তার উপর। শুভকামনা।

     

    বি:দ্র: লেখনীতে উল্লিখিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত বিবেচনায় লেখা। ভুল প্রমাণিত হলে নিজগুণে ক্ষমা করবেন।